অনলাইন ডেস্ক: শিক্ষার্থী পাচ্ছে না ছোট ও মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। মূলত এইচএসসিতে শিক্ষার্থী পাসের হার কমায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাবে দেশে কিন্ডারগার্টেনের আদলে গড়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীর অভাবে বর্তমানে মহাসংকটে পড়েছে। বর্তমানে অনুমোদিত ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও মাত্র ২০ থেকে ২৫টি সঠিকভাবে চলছে। বর্তমানে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে ৭০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ালেখার মানও প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া অন্তত অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি বা ট্রেজারারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদই শূন্য রয়েছে। যদি বিগত ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু সংকট থেকে মিলছে না উত্তরণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে উচ্চশিক্ষায় মোট প্রায় ১৩ লাখ আসন রয়েছে। তার মধ্যে ৬০ হাজারের কাছাকাছি আসন সংখ্যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিক্যাল-ডেন্টাল কলেজ ও বিশেষায়িত কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে স্নাতকে (সম্মান) ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫ ও পাস কোর্সে ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৯০, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসায় ৪৬ হাজার ৫২৯, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৭ হাজার ৫৯৩ আসন সহ সরকারি আরো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারের বেশি আসন রয়েছে। তাছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকে (সম্মান) এক সেমিস্টারে এক লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯ (বছরে দুই সেমিস্টার হিসেবে পৌনে ৪ লাখ) আসন রয়েছে। তিন সেমিস্টার হিসাব করলে আসন আরো বাড়বে। তবে গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মাত্র ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। ফলে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসনই পূর্ণ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ও মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী সঙ্কটে পড়েছে।
সূত্র জানায়, দেশের মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থী। আর আয় না থাকায় ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো শিক্ষকও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই এক-দুজনের বেশি অধ্যাপক নেই। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। কোনো রকমে একটি ভবনের এক-দুটি ফ্লোর ভাড়া করে চলছে ওসব বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক নেই, ল্যাবরেটরি নেই, পাঠাগার নেই, ক্লাসও ঠিকমতো হয় না। অনেকটা নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়। ওসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা না করলেও নির্দিষ্ট সময় পর শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে সার্টিফিকেট। মূলত বিগত সময়ে কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেছে। ফলে এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই বন্ধ হওয়ার পথে। নামেমাত্র চালু রয়েছে। আবার নানা নেতিবাচক কারণে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তারকা চিহ্ন দিয়ে আলাদা করেছে ইউজিসি। ওসব বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। তাছাড়া আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি। মূলত বিগত ২০১৬ সাল থেকে দেশে এইচএসসি ও সমমানে পাসের হার বাড়তে থাকে। আর ২০২০ সালে অটোপাস দিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে দেয়া হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় ওই বছর পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫.৯৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৭৮.৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালে পাসের হার কমে ৫৮.৮৩ শতাংশ দাঁড়ায়। আর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলেও এখন ফলের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা।
সূত্র আরো জানায়, অনুমোদিত চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন থাকার কথা। কিন্তু এর অর্ধেক জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৪টি প্রোগ্রামের অনুমোদন রয়েছে। ওই হিসাবে কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ৩৩ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জনই প্রভাষক। আর একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং ৭ জন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যাও খুব কম এবং প্রভাষকদের নামমাত্র বেতন দেয়া হয়। তবে বেসরকারি ১০ থেকে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সঙ্কটে নেই। এমনকি কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীরা পরের ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়।
এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ১১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫৩টি পুরোপুরি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে। আর এখন পর্যন্ত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী সনদ পেয়েছে। আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলেও যেতে পারছে না। কেউ জমি কিনে ফেলে রেখেছে। তাছাড়া আর্থিক সংকটে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মান দিয়েই টিকে থাকতে হবে। শিক্ষার মান ভালো স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে। আর মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়বে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও আফ্রিকার অনেক দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে আসতে আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে পারে।
সূত্র: এফএনএস এক্সক্লুসিভ